আম আঁটির ভেঁপু

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো…

গল্পঃ পাশবিক আমিত্ব

কয়দিন ধরে শীত জেকে বসেছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উত্তরীয় হাওয়ার হাড়ে কাঁপন লাগানো প্রবাহ। সূর্যী মামা কয়েক মুহুর্ত তার লাজুক মুখখানা দেখিয়ে কোথায় যে পালায়! গত কয়দিন ধরে টিউশনিতে যাই নি। আজ না গেলে পকেট খরচের বিলাসী উৎসটা বন্ধ হয়ে যাবে, এই ভয়ে বের হয়েছি। খুব বিরক্তি আর মেজাজ খারাপ লাগছে। আগে তো শাহবাগের মোড় থেকেই বাসে উঠতাম, এখন অনেক দূর হেঁটে গিয়ে আজিজ মার্কেটের সামনে থেকে উঠতে হয়। রাস্তায় দীর্ঘ যানজট। এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি বাসের দেখা নেই। সব কোম্পানীরই বাস আসছে, শুধু আমি যাদের টিকিট কেটেছি তাদের কোনো খবর নেই। শীত নিবারণের জন্য কতই না ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালালাম! জিন্সের প্যান্ট, জ্যাকেট, কান টুপি। তবুও উত্তরীয় হাওয়ায় ঠকঠক করে কাঁপছি। হতাৎ অনুভব করলাম কে যেন পিছন থেকে জ্যাকেটের কোণা ধরে টানছে।

-ছাড়! ছাড়গো! দুইডা টাহা দ্যান।
-মাফ কর।
-দ্যান না ছাড় দুইডা টাহা!
-বিরক্ত করিস না। যা সর!
-ছাড় কাইল থন কিছু খাই নাই। দ্যান না দুইডা টাহা।

মেজাজ আমার চরম সপ্তমে উঠে গেল। চোখ বড় বড় করে ধমকের সুরে বললাম,
-যা ভাগ! কানে কথা যায় না?

ছেলেটি মুখ শুকনো করে সামনের দিকে এগোল। হয়ত আমারই মত কোনো নিষ্ঠুর অথবা দয়ার্দ কারো কাছে যাবে ‘দুইডা টাহা’ চাইতে। হয়ত কোনো নিষ্ঠুর আমারই মত আচরন করবে। অথবা কোনো দয়ার্দ মানুষ (কোনো এক নারী, কারন নারীদের মন মায়ের মত, বোনের মত; খুব সহজেই মায়ায় পড়ে যায়।) ‘দুইডা টাহা’ দিয়ে দিবে।

আমি ছেলেটির দিকে ভালো করে তাকালাম। বয়স আর কত হবে, আট কি নয়? ময়লা ছেঁড়া নীল রঙা একটা গেঞ্জি আর খুব ছোট একটা হাফ প্যান্ট পড়া। শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। হাঁটতে পাড়ছে না। মনে হল যেকোন সময় পড়ে যেতে পারে। আমার ভিতরের ‘পশু আমিটা’ পরাজীত হল। খুব মায়া হল ছেলেটার জন্য। আমি ছেলেটাকে ডাকলাম,
-এই এদিকে আয়! শোন!

ছেলেটি ভয়ে ভয়ে ফির এল। আমি মানি ব্যাগ থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে দিলাম। খুশিতে ডগমগ করে উঠল ছেলেটির চোখ। আমার মনেও একটা ভালো লাগার আবেশ ছুঁয়ে গেল।
-তোর মা বাবা কী করে?
ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না। মন খারাপ করে শূন্য দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে রইলো। ওর চোখ ছলছল করছিল। কান্না খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়। আহা! আমারও চোখ কেন জানি ভিজে আসছে। মনে কপট কাঠিন্য এনে বললাম,
-কিরে! কথা কস না ক্যান!
-ছাড়! আমার বাপ মারে আমি কুনু দিন দেহি নাই।

আমি ভিতরে ভিতরে গুমরে কাঁদছিলাম। চোখের পানি খবরদার বের হবি না! খবরদার না! আহা! মা বাপ ছাড়া এই ছোট্ট ছেলেটি বাঁচে কী করে? আহা! অতটুকুন মানুষের কত কষ্ট!
-তুই থাকস কই?
-ছাড়! রাস্তাত রাস্তাত ঘুরি। রাত হইলে রাস্তাতই হুইয়া পড়ি।
-কারো কাছে শীতের কাপড় চাইতে পাড়স না?
-চাইতো ছাড়! কেউতো দিবার চায় না।

আমি ভাবি, আমাদের হলে পুরনো শীত বস্ত্র স্তুপ হয়ে পড়ে আছে। কেউ নিতে আসে না। হলের মামারা শেষে এই কাপড়্গুলো বিক্রি করে দেয়। আর ওরা শীতের কাপড়ের জন্য কত কষ্ট পায়।
-তুই ইনভার্সিটির হলে আসতে পাড়স না? কেউ না কেউ তোরে শীতের কাপড় দিবেই।
ছেলেটি চুপ করে থাকে। ক্রমশ তার মুখে একটা ভয়ের রেখা ফুটে উঠছে।
-কিরে কথা কস না ক্যান?
-ইনভার্সিটির ছাড়রা ভালা মানুষ না। একবার গেছিলাম। আমারে মুবাইল চুর কয়ে খুব মারছে।

ছেলেটি ডান পায়ের রানের উপরের জখমটা আমাকে দেখাল। আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। ভালো করে খেয়াল করলাম, ছেলেটির মুখেও আঘাতের চিহ্ন আছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। কী জানি, আমাকে পালানোর সুযোগ করে দিয়ে আমার কাঙ্খিত বাসটি চলে এল। নিজের অপরাধ আড়াল করার জন্য খুব দ্রুত বাসে উঠে গেলাম। আড় চোখে দেখলাম, ছেলেটি আমার চলে যাওয়া পথের দিকে তাঁকিয়ে আছে। তার চোখে কী কথা খেলছিল? জানি না। আর কোনো দিনও জানা হবে না। আমার ভিতর আবার ক্রমশ ‘পশু আমি’ জেগে উঠছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on জানুয়ারি 13, 2010 by in গল্প and tagged .

নেভিগেশন

%d bloggers like this: