আম আঁটির ভেঁপু

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো…

অন্নদামঙ্গল কাব্য

১.
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।

২.
নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়।

৩.
মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।

৪.
বড়র পিরীতি বালির বাঁধ,
ক্ষনে হাতে দড়ি ক্ষনেকে চাঁদ।

৫.
অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ,
কোন গুন নাই তার কপালে আগুন।

৬.
না রবে প্রাসাদ গুন নাহবে রসাল,
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশান।

উপরের জনপ্রিয় উদ্ধৃতিগুলো কম বেশি আমরা সবাই জানি। এই উদ্ধৃতিগুলো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি মঙ্গল কাব্যধারার ‘অন্নদামঙ্গল কাব্য’ থেকে নেওয়া। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কবি, নাগরিক কবি ভারতচন্দ্রঁ রায়গুনাকরের অসাধারন শিল্পকর্ম এই অন্নদামঙ্গল কাব্য।

মঙ্গল কাব্যের প্রেক্ষাপট
আবহমানকাল থেকেই বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। নদীনালা, খালবিল, অরণ্য, জলাভূমিতে ভরা। ঝড়ঝঞ্ঝা, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, নদী ভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বাঘ, কুমীর, সাপ ইত্যাদী হিংস্র জন্তু; কলেরা, বসন্ত, কালাজ্বর ইত্যাদি ভয়ঙ্কর রোগ ব্যাধি এদেশের অদিবাসীদের প্রায়ই মৃত্যুকবলিত করত। এই সমস্ত প্রতিকারহীন অদৃশ্য উপদ্রবের কাছে তারা নিজেদেরকে বড় অসহায় মনে করতে লাগল। তারা ভীত হয়ে ভাবল, এই সমস্ত উপদ্রব ঘটানোর ক্ষমতা নিশ্চয়ই অদ্ভুত ক্ষমতাধর কারে হাতে রয়েছে, এই অদ্ভুত ক্ষমতাধরর্টিকেই তারা দেবতারূপে কল্পনা করল। তারা ধরে নিল, এক একজন দেবতা বা দেবী এক একটি উপদ্রব ঘটায়। সাপের ক্ষেত্রে সর্পদেবী মনসা, ঝড় ঝঞ্ঝার ক্ষেত্রে চন্ডী দেবী, বাঘের ক্ষেত্রে দক্ষিণা রায়, ওলাউঠা বসন্তের ক্ষেত্রে দেবী শীতলা ইত্যাদী এইরূপ নানা দেব দেবীর উত্থান হল। এই দেব দেবীদের সন্তুষ্ট রাখতে, এঁদের মাহাত্ন্য কথা মুখে মুখে তৈরী করে গাওয়া হত। এভাবেই মঙ্গল কাব্যের সৃষ্টি। দেব দেবীর মাহাত্ন্য বর্ণানামূলক কাব্যই মঙ্গলকাব্য। শাস্ত্রকারদের মতে, যে কাব্য পাঠ করলে ও শ্রবণ করলে, এমনকি গৃহে রাখলেও গৃহস্থের সব অকল্যাণ দূর হয় এবং মঙ্গল হয়, তাই মঙ্গল কাব্য।

মঙ্গল কাব্যের ধারা
মঙ্গল কাব্যের প্রধান তিনটি ধারা দেখা যায়, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল।
সর্পদেবী মনসার মাহাত্ন্যকথা মনসামঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। মনসামঙ্গলের প্রায় শতাধিক কবির নাম পাওয়া যায়। এঁদের মধ্যে কানাহরি দত্ত, বিজয় গুপ্ত, নারায়ন দেব, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস ও কেতকদাস ক্ষেমানন্দ সমধিক পরিচিত।
দেবী চণ্ডীর মাহাত্ন্যকথা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। দেবী চণ্ডীর বিভিন্ন নাম আছে। দূর্গা, সারদা, অন্নদা ইত্যাদি। তাই অন্নদামঙ্গল ও সারদামঙ্গল কাব্য চণ্ডীমঙ্গলধারাভুক্ত, পৃথক কোন ধারা নয়। কবি মানিক দত্ত, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম, দ্বিজ মাধব, ভারতচন্দ্র রায়গুনাকর চণ্ডীমঙ্গলধারার প্রধানকবি।
ধর্মঠাকুরের মাহাত্ন্যকথা ধর্মমঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। রামাই পন্ডিতের ‘শুন্যপুরান’ ও ময়ূর ভট্টের ‘হাকন্দপুরান’ ধর্মমঙ্গলধারার দুটি বিখ্যাত কাব্য।ময়ূরভট্ট, রামাই পন্ডিত, মানিকরাম গাঙ্গুলী, রূপরাম চক্রবর্তী ধর্মমঙ্গলকাব্যধারার প্রধানকবি।

ভারতচন্দ্র রায়গুনাকর
ভারতচন্দ্র ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার পাণ্ডুয়া গ্রামে এক জমিদার বংশে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতা নারায়নচন্দ্র রায় ও মাতা ভবানী দেবী। ভারতচন্দ্র নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন। তিঁনি বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি, পারসি ও আরবী ভাষা জানতেন। ‘অন্নদামঙ্গল’ ছাড়াও তিঁনি ‘সত্য পীরের পাঁচালী’ নামক আরো একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিঁনি ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

অন্নদামঙ্গল কাব্য
‘অন্নদামঙ্গল’ ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে এটি রচিত হয়। অন্নদামঙ্গল্ কাব্য তিনটি খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ড ‘অন্নদামঙ্গল’; দ্বিতীয় খন্ড ‘বিদ্যাসুন্দর’ ও তৃতীয় খন্ড ‘মানসিংহ’।
প্রথম খন্ডে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দি কর্তৃক ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের পৃষ্ঠপোষক রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং কৃষ্ণচন্দ্র কর্তৃক অন্নপূর্ণাদেবীর পূজা করে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় খন্ডে মোঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলায় আগমন ও বর্ধমানে সুন্দর কর্তৃক তৈরী সুড়ঙ্গ দর্শন কাহিনী বর্ণনা আছে। এ অংশ সংস্কৃতকাব্য ‘চৌরপঞ্চাশৎ’ অবলম্বনে রচিত হলেও বিদ্যা ও সুন্দরের প্রণয়কাহিনী রচনায় ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য।
তৃতীয় খন্ডে মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ভবানন্দ মজুমদারের সহায়তায় যশোররাজ প্রতাপাদিত্যকে বন্দি করে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে নেওয়ার জন্য দিল্লী রওনা দেন। সংগে ভবানন্দকেও নিয়ে যান পুরস্কার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে।কিন্তু সম্রাট সমস্ত বিবরণ শুনে দেবী অন্নপূর্ণাকে কটাক্ষ করায় ভবানন্দ প্রতিবাদ করলে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এতে দেবীর অনুচর ভূতপ্রেত দিল্লী শহর তছনছ করে দেয়। তখন বাধ্য হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর ভবানন্দকে মুক্তি দিয়ে প্রচুর উপঢৌকন ও ‘রাজা’ উপাধী দিলেন এবং দেবী অন্নদার পূজা করে বিপদ থেকে মুক্ত হলেন। ভবানন্দ দিল্লী থেকে ফিরে ঘটাকরে দেবী অন্নপূর্ণার পূজা প্রচার করে পরিশেষে স্বর্গারোহণ করলেন। এখানেই তৃতীয় খন্ডের মঙ্গলকাব্যের সমাপ্তি।

সূত্রঃ ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা দর্পন।

পূর্বের পর্বঃ
চর্যাপদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on জানুয়ারি 25, 2010 by in সাহিত্য and tagged .

নেভিগেশন

%d bloggers like this: