আম আঁটির ভেঁপু

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো…

মনসামঙ্গল কাব্য

মঙ্গল কাব্যধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্য মনসামঙ্গল। সর্পদেবী মনসার মাহাত্ন্য, স্তুতি ও কাহিনি নিয়ে রচিত মনসামঙ্গল। একে মনসাবিজয় বা পদ্মপুরাণ নামেও অভিহিত করা হয়। আবহমান কাল থেকেই বাংলাদেশ নদীনালা, খালবিল, জলাশয়ে ভরা। গ্রাম বাংলার সর্প ভয়ে ভীত সাধারণ মানুষের কাছে মনসামঙ্গল শ্রী চৈতন্যপূর্ব যুগ থেকেই ব্যপকভাবে সমাদৃত। চাঁদ সওদাগরের প্রথম দিকে মনসা বিরূপতা, পরে মনসা দেবীর অলৌকিক শক্তির প্রভাব স্বীকার করে তার বশ্যতা মেনে পূজো দেওয়াই এই কাব্যের প্রধান আখ্যান হলেও, এর মাঝে বাংলার প্রাকৃতিক জীবন, লৌকিক জীবনাচার উঠে এসেছে। চাঁদ সওদাগর, বেহুলা, লখিন্দর যেন আমাদের খুব কাছের কেউ, আমাদেরই একজন। চাঁদ সওদাগরের পুত্র বাৎসল্য, বেহুলার পতিপ্রেম অতি মানবীয়ভাবে উঠে এসেছে এই কাব্যে।

কানা হরিদত্ত মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি। এছাড়াও বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ প্রমুখ মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেছেন।

বিপ্রদাস পিপিলাই এর মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনী সংক্ষেপ

হিন্দু পূরাণ অনুসারে, চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী, তবে মনসা তাকে নিজস্ব পূজারী করার পরিকল্পনা করে। মনসা তার সকল কলাকৌশল অবলম্বন করে চাঁদ সওদাগরের মত বদলানোর চেষ্টা করলেও চাঁদ সওদাগর শিবের কাছ থেকে দিক্ষা পাওয়া মন্ত্র ও বেদবাক্য দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে। একসময় মনসা চাঁদ সওদাগরের কাছে সুন্দরী নারীর বেশে এসে হাজির হলে চাঁদ সওদাগর তাকে তার গোপন কথা জানিয়ে দেয়। ফলে, চাঁদ তার বেদবাক্যের ফলে প্রাপ্ত অলৌকিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। চাঁদ এরপর শঙ্করের সাহায্য গ্রহণ করে। পূর্ণশক্তির ক্ষমতা চাঁদ সওদাগরের চেয়েও বেশি হলেও মনসা তাকে হত্যা করে চাঁদ সওদাগরকে পুনরায় অসহায় করে ফেলে।

এরপরও চাঁদ সওদাগর মনসার পূজা করতে অস্বীকৃতি জানালে মনসা সাপ পাঠিয়ে তার ছয় সন্তানকে হত্যা করে। ফলে, চাঁদ সওদাগর হতাশ হয়ে তার ব্যবসা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। প্রতিকূল পরিস্থিত স্বত্ত্বেও চাঁদ ব্যবসার উদ্দেশে আবার সমুদ্র যাত্রা শুরু করে। একটি সফল ব্যবসায়িক অভিযানের পর জাহাজভর্তি সম্পদ নিয়ে চাঁদ ঘরে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করে। মনসা একটি ঝড় উত্পন্ন করে এবং চাঁদ প্রথমিক পর্যায়ে দূর্গার সাহায্য নিয়ে রক্ষা পেলেও পরবর্তীতে মনসার অনুরোধের প্রেক্ষিতে শিব দূর্গাকে সরে যেতে বলে। এরপর চাঁদ সওদাগরের জাহাজ ডুবে যায় এবং মনসা তাকে একটি দ্বীপে নিয়ে আসে। এই দ্বীপে চাঁদ তার পুরনো বন্ধু চন্দ্রকেতুর দেখা পায়।

চন্দ্রকেতু চাঁদ সওদাগরকে মনসার অনুসারী করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও সে দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে। সে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েও কেবল শিব আর দূর্গার পূজা করতে থাকে। মনসার কাছে মাথা না নোয়াতে চাওয়ায় সে তার স্বর্গের দুই বন্ধু – দু’জন অপ্সরার সাহায্য গ্রহণ করে। তারা পৃথিবীতে মানব হিসেবে জন্ম নিতে রাজি হয়। একজন চাঁদ সওদাগরের পুত্র ও অন্যজন চাঁদের ব্যবসায়িক সতীর্থ সাহার কন্যা হিসেবে জন্মগ্রহণ করে।

চম্পকনগরে ফিরে এসে চাঁদ সওদাগর তার জীবন নতুন করে গড়তে সমর্থ হয়। তার একটি সন্তান জন্ম লাভ করে। তারা সন্তানটির নাম রাখে লখিন্দর। কাছাকাছি সময়ে সাহার স্ত্রী একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয় যার নাম রাখা হয় বেহুলা। দুটি শিশুই একসাথে বেড়ে ওঠে এবং একে অপরের জন্য সম্পুর্ণ উপযুক্ত বলে গণ্য হয়। তবে যখন তাদের রাশি গণণা করা হয় এবং দেখা যায় যে, বিয়ের রাতে লখিন্দর সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করবে। যেহেতু উভয়ই তখন মনসার অনুসারী এবং তাদের ভেতরে প্রচুর সাদৃশ্য তাই তাদের বিবাহ নির্ধারিত হয়। চাঁদ সওদাগর অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে এমন বাসর ঘর তৈরি করেন যা সাপের পক্ষে ছিদ্র করা সম্ভব নয়।

কিন্তু সকল সাবধানতা স্বত্ত্বেও মনসা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমর্থ হয়। তার পাঠানো একটি সাপ লখিন্দরকে হত্যা করে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে যারা সাপের দংশনে নিহত হত তাদের স‌ৎকার প্রচলিত পদ্ধতিতে না করে তাদের মৃতদেহ ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হত এ আশায় যে ব্যক্তিটি হয়ত কোন অলৌকিক পদ্ধতিতে ফিরে আসবে। বেহুলা সবার বাঁধা অগ্রাহ্য করে তার মৃত স্বামীর সাথে ভেলায় চড়ে বসে। তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পঁচে যেতে শুরু করে এবং গ্রামবাসীরা তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করতে থাকে। বেহুলা মনসার কাছে প্রার্থনা অব্যাহত রাখে। তবে মনসা ভেলাটিকেই কেবল ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

একসময় ভেলাটি মনসার পালক মাতা নিতার কাছে আসে। তিনি নদীতীরে ধোপার কাজ করার সময় ভেলাটি ভূমি স্পর্শ করে। তিনি মনসার কাছে বেহুলার নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা দেখে বেহুলাকে তার কাছে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে চোখের পলকে বেহুলা ও মৃত লখিন্দরকে স্বর্গে পৌছে দেন। মনসা বলে, তুমি তাকে (লখিন্দরকে) ফিরে পাবার যোগ্য, কিন্তু এটি কেবলি সম্ভব হবে যদি তুমি তোমার শ্বশুর়কে আমার পূজারী করতে পার।

“আমি পারব”, বেহুলা জবাব দেয় এবং সেই সাথেই তার স্বামীর মৃতদেহে জীবন ফিরে আসতে শুরু করে। তার ক্ষয়ে যাওয়া মাংস ফিরে আসে এবং লখিন্দর তার চোখ মেলে তাকায়। এরপর লখিন্দর বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসে।

তাদের পথপ্রদর্শক নিতাকে নিয়ে তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। বেহুলা তার শ্বাশুরীর কাছে সবকিছু খুলে বলে। তিনি চাঁদ সওদাগরের কাছে গিয়ে তাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেন। চাঁদ সওদাগর আর মনসাকে না বলতে পারেনি।

চাঁদ সওদাগর মনসাকে প্রতি মাসের অমাবস্যার এগার তারিখে মনসা পূজা করে। তবে দেবীর দেয়া সকল কষ্টের জন্য তাকে সে ক্ষমা করতে পারে না। সে তার প্রতিকৃতি থেকে মুখ সরিয়ে বাম হাতে তাকে ফুল প্রদান করে। তবে সেজন্য মনসা তার উপর আর কোন আক্রোশ রাখে না। তখন থেকে চাঁদ সওদাগর ও তার পরিবার সুখে ও সমৃদ্ধিতে বসবাস করতে থাকে। চাঁদ সওদাগরের মর্যাদা ও সম্মান পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মনসাকে পূজা করা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানীয় বলে বিবেচিত হতে থাকে।

কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ
পশ্চিমবঙ্গবাসী মনসামঙ্গল কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ সর্বশ্রেষ্ঠ। ‘ক্ষেমানন্দ’ তাঁর প্রকৃত নাম এবং ‘কেতকাদাস’ তাঁর উপাধী। মনসাদেবীর পরম ভক্ত বলে কবি কোথাও কোথাও নিজেকে ‘কেতকাদাস’ বলেছেন। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ বর্ধমান জেলার কাঁদড়া গ্রামের অধিবাসী এবং জাতিতে কায়স্থ ছিলেন।নানা প্রকার অশান্তির দরুন তিঁনি দেশত্যাগ করেন। বিচিত্র পরিবেশ ও অবস্থার মধ্যে কবির বাল্যকাল কাটে। কবির কাব্য রচনাকালের কোনো স্পস্ট উল্লেখ নেই। সপ্তদশ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে তিঁনি কাব্য রচনা করে থাকবেন।

মনসামঙ্গল
কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ


মনসা কর্তৃক চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা ডুবাইবার মন্ত্রণা

চম্পক নগরে ঘর চাঁদ সদাগর ।
মনসা সহিত বাদ করে নিরন্তর ।।
দেবীর কোপেতে তার ছয় পুত্র মরে ।
তথাচ দেবতা বলি না মানে তাঁহারে ।।
মনস্তাপ পায় তবু না নোয়ায় মাথা ।
বলে চেঙমুড়ী বেটী কিসের দেবতা ।।
হেতাল লইয়া হস্তে দিবানিশি ফেরে ।
মনসার অন্বেষণ করে ঘরে ঘরে ।।
বলে একবার যদি দেখা পাই তার ।
মারিব মাথায় বাড়ি না বাঁচিবে আর ।।
আপদ ঘুচিবে মম পাব অব্যাহতি ।
পরম কৌতুকে হবে রাজ্যেতে বসতি ।।
এইরূপে কিছু দিন করিয়া যাপন ।
বাণিজ্যে চলিল শেষে দক্ষিণ পাটন ।।
শিব শিব বলি যাত্রা করে সদাগর ।
মনের কৌতুকে চাপে ডিঙ্গার উপর ।।
বাহ বাহ বলি ডাক দিল কর্ণধারে ।
সাবধান হয়ে যাও জলের উপরে ।।
চাঁদের আদেশ পাইয়া কাণ্ডারী চলিল ।
সাত ডিঙ্গা লয়ে কালীদহে উত্তরিল ।।
চাঁদবেনের বিসম্বাদ মনসার সনে ।
কালীদহে সাধু দেবী জানিল ধেয়ানে।।
নেতা লইয়া যুক্তি করে জয় বিষহরী ।
মন সনে বাদ করে চাঁদ অধিকারী ।।
নিরন্তর বলে মোরে কানী চেঙমুড়ী ।
বিপাকে উহারে আজি ভরা ডুবি করি ।।
তবে যদি মোর পূজা করে সদাগর ।
অবিলম্বে ডাকিল যতেক জলধর ।।
হনুমান বলবান পরাৎপর বীর ।
কালীদহে কর গিয়ে প্রবল সমীর ।।
পুষ্প পান দিয়া দেবী তার প্রতি বলে ।
চাঁদবেনের সাত ডিঙ্গা ডুবাইবে জলে ।।
দেবীর আদেশ পাইয়া কাদম্বিনী ধায় ।
বিপাকে মজিল চাঁদ কেতকাতে গায় ।।

গদ্যান্তরঃ
চম্পক নগরে চাঁদ সদাগরের বাস। সর্পদেবী মনসার সঙ্গে তাঁর চিরকালীন বিবাদ। দেবীর রোষে মারা গেছে চাঁদের ছয় পুত্র। বিস্তর শোকতাপ পেয়েছেন। তবুও দেবতা বলে মানেননি মনসাকে। “চ্যাঙমুড়ি বেটি আবার কিসের দেবতা!” দিনরাত হেতালের ডাল হাতে ঘরে ঘরে মনসার সন্ধান করে ফেরেন আর বলেন, “একবার যদি দেখা পাই তার, এই লাঠির বাড়ি মাথায় মেরে মেরেই ফেলব তাকে। আপদ ঘুচবে আমার। অব্যাহতি পাবো। তখন সুখে শান্তিতে বাস করতে পারব রাজ্যে।”
এইভাবে কিছুদিন কাটার পর শেষে চাঁদ স্থির করলেন যে বাণিজ্যে যাবেন দক্ষিণ দেশে। মনের আনন্দে ডিঙায় চেপে ‘শিব শিব’ বলে যাত্রা করলেন। “বাহ বাহ,” ডাক দিলেন কাণ্ডারীকে, “সাবধান হয়ে যাও জলের উপরে।” কাণ্ডারীও চাঁদের আদেশ পেয়ে এগিয়ে চলল। সপ্তডিঙা উপস্থিত হল কালীদহে।

এদিকে ধ্যানযোগে বিষহরী মনসা জানতে পারলেন, সাধু চাঁদ সদাগর কালীদহে। অমনি বসলেন সখি নেতার সঙ্গে মন্ত্রণা করতে, “চাঁদ সদাগর কেবল বিবাদই করে আমার সঙ্গে। শুধু বলে চেঙমুড়ি কানি। এইবেলা দুর্বিপাকে তার ভরাডুবি করি। তবে যদি সে আমার পূজা করে।” এই বলে মনসা আহ্বান করলেন আকাশের মেঘের দলকে। আহ্বান করলেন মহাবীর হনুমানকে। পবননন্দনের হাতে পুষ্প ও পান দিয়ে অনুরোধ করলেন, “তুমি গিয়ে কালীদহে প্রবল বাতাস বইয়ে দাও। চাঁদ বণিকের সপ্ত ডিঙা জলে ডোবাও।” দেবীর আদেশ পেয়ে উড়ে চলল মেঘের দল। চাঁদের মাথার উপর তখন বিপদের কালো ছায়া।


চাঁদের নৌকাডুবি

দেবীর আজ্ঞায় হনুমান ধায়
সাথে লয়ে মেঘগণ।
পুষ্কর দুষ্কর আইল সত্বর
করি ঝড় বরিষণ ।।
আসি কালীদয় উভয়েই কয়
ডুবাইতে সাধুর তরী।
বীর হনুমান অতি বেগে যান
করিবার ঝড় বারি ।।
অবনী আকাশে প্রখর বাতাসে
হৈল মহা অন্ধকার।
গৈঁঠার গাবর নায়ের নফর
নাহিক দেখে নিস্তার ।।
গজ শুণ্ডাকার পড়ে জলধার
ঘন ঘোর তর্জনে গর্জে।
মনে পাইয়া ডর বলে সদাগর
যাইতে নারিলাম রাজ্যে ।।
হুড় হুড় হুড় পড়িছে চিকুর
যেন বেগে ধায় গুলি।
বলে কর্ণধার নাহিক নিস্তার
ভাঙ্গিল মাথার খুলি ।।
দেখিবে অদ্ভুত খেলিছে বিদ্যুৎ
ছাইল গগনে ভানু
বিপদ গণিয়া বলিছে কান্দিয়া
কেন বা বাণিজ্যে আইনু ।।
তরী সাতখান চাপি হনুমান।
চক্রাবর্তে দেয় পাক।
ঘন ঘন ঝড়ে ছই গেল উড়ে
প্রবল পবন ডাক ।।
হাঙ্গর কুম্ভীর আসিয়া বিস্তর
তরী আশে পাশে ভাসে।
জলে ডিঙ্গা লয়ে, রাখে পাক দিয়ে
অহি ধায় গ্রাস আশে ।।
বিপদ ঘটালে কালীদ উথলে
তরঙ্গে তরণী বুড়ে।
হইয়া বিকল কান্দিয়া সকল
জলে ঝাঁপ দিয়া পড়ে ।।
মেঘের গর্জনে আর বরিষণে
কাণ্ডারী কাঁপিছে শীতে।
শক্তি নাহি নড়ে মূর্ছাগত পড়ে
সবে রহে এক ভিতে ।।
ডিঙ্গার নফরে গ্রাসিল হাঙ্গরে
কাছি তার গিলে মাছে ।
চাপিয়া তরণী হনুমান আপনি
হেলায় দোলায়ে নাচে ।।
ঘন পড়ে ঝঞ্ঝনা ভাসিল ফাতনা
ভেসে গেল কালীদহ জলে ।
ডিঙ্গা হৈল ডুবু ডুবু মনসার নাম তবু
সদাগর মুখে নাহি বলে ।।
যা করেন শিবশূল এবারে পাইলে কূল
মনসাকে বধিব প্রাণে।
যত বলে বেনিয়া এই সব শুনিয়া
কোপে জ্বলে বীর হনুমানে ।।
করি তবে হুড়মুড় তুলিল প্রবল ঝড়
হনুমান বাড়িল যে বলে।
মতিগতি মনসার ঘা মারিয়া পদের
সাত ডিঙ্গা ডুবাইল জলে ।।
কান্দয়ে বাঙ্গাল হইনু কাঙ্গাল
ভেসে গেল পোস্তের হোলা।
বিপদ সাগরে জলের উপরে
ভাসিয়া নিদান বেলা ।।
ডুবাইয়া নায় চাঁদ জল খায়
বিষহরী খলখল হাসে।
জয় জয় মনসা তুমি মা ভরসা
রচিলেক কেতকা দাসে ।।

গদ্যান্তরঃ
দেবীর আজ্ঞায় অনুগত মেঘের দল সঙ্গে নিয়ে উড়ে চলল হনুমান। সঙ্গে চলল দুই মেঘ পুষ্কর আর দুষ্কর। ঝড়-বাদল নিয়ে হাজির হল তারা কালীদহে। সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বাতাস বইতে শুরু করল। মেঘে মেঘে অন্ধকার হয়ে গেল আকাশ। জলের ধারা হাতির শুঁড়ের মতো ভীষণ গর্জন করতে করতে আছড়ে পড়তে লাগল নৌকার উপর। তাই দেখে নৌকার দাঁড়ি মাঝি থেকে চাকরবাকর সকলেই ভয় পেয়ে গেল। ভয় জাগল চাঁদের মনেও। “আর বুঝি রাজ্যে ফেরা হবে না,” তিনি বলতে লাগলেন। এদিকে গুলি ছোটার মতো হুড়মুড় শব্দে বাজ পড়ছে। ঢাকা পড়ে গেছে সূর্য। কাণ্ডারী চিৎকার করে বলছে, “আর নিস্তার নেই ! আজই উড়ে যাবে মাথার খুলি !” মাল্লারা কেঁদে বলছে, “কেনই বা বাণিজ্যে এলাম !” এমন সময় সাতখানা নৌকার মাথায় চড়ে পাক দিতে লাগল হনুমান। বাতাস গর্জন করতে করতে উড়িয়ে দিল নৌকার ছই। ডুবন্ত নাওয়ের ধারে খাদ্যের লোভে এসে জুটতে লাগল যত হাঙর, কুমির আর সাপ। এদিকে ঢেউ আছড়ে পড়ছেই। নৌকা হাবুডুবু। মেঘের গর্জনে আর শীতে থরথর করে কাঁপতে লাগল কাণ্ডারী। ডিঙার চাকরবাকররা একে একে হাঙরের পেটে যেতে লাগল। কাছি ছিঁড়ে গেল মাছের পেটে। বাজ পড়ল ফাতনার উপর। সেটা ছিড়ে গেল ভেসে। তবু চাঁদ একটিবারের জন্যেও উচ্চারণ করলেন না মনসার নাম। “যা করেন শিব শূলপাণি,” বললেন চাঁদ, “তবে এবার কুল পেলে মনসার প্রাণ নির্ঘাত নেব।” এসব শুনে মনসার দাস হনুমানের সারা শরীর জ্বলতে লাগল রাগে। পায়ের এক চাপে সে ডুবিয়ে দিল নৌকা। পোস্তের মালসা ভেসে গেল জলে। বাঙালরা হাহুতাশ করে উঠল। জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগলেন চাঁদও। আর তাই দেখে খলখল করে হেসে উঠলেন মনসা।


চাঁদের দুর্জয় মনোবল

ধুয়া। হুড়ুর বাফৈ বাফৈ
লম্ফ দিয়া বহিত্রে চাপিল হনুমান।
চক্রাবর্তে ঘোরে ডিঙ্গা সাধু কম্পমান।।
শিরে হস্ত দিয়া কান্দে সকল বাঙ্গাল।
সকল ডুবিনু জলে হইনু কাঙ্গাল ।।
পোস্তের হোলা ভেসে গেল ছাকিনার কানি।
আর বাঙ্গাল বলে গেল ছেঁড়া কাঁথাখানি।।
ধুলায়ে লোটায়ে কান্দে যত বাঙ্গালেরা।
সাত গেঁটে টেনা তার হয় জ্ঞানহারা ।।
বিপাকে হারানু প্রাণ চাঁদবেনের পাকে।
ডাকাচুরি নহে ভাই কব গিয়া কাকে।।
যতেক বাঙ্গাল তারা দিকে দিকে ধায়।
মনসার হটে চাঁদবেনে জল খায় ।।
চক্ষু রাঙ্গা ভরে পেট খাইয়া চুবানি।
তবু বলে দুঃখ দিলি চেঙমুড়ী কানী।।
শুনিয়া হাসেন রথে জয় বিষহরী।
ঢোকে ঢোকে জল খায় চাঁদ অধিকারী ।।
সাধুর দুর্গতি দেখি মনসা ভাবিয়া।
বসিবারে শতদল দিল ফোলাইয়া।।
জল খাইয়া রক্তচক্ষু নাহি দেখে কূল।
হেনকালে সম্মুখে দেখিল পদ্মফুল ।।
চাঁদ বলে ঐ পদ্ম মনসায় জন্ম।
হেন পদ্ম পরশিলে আমার অধর্ম।।
এত ভাবি চাঁদবেনে না ছুঁইল ফুল।
জল খাইয়া মরে প্রাণে নাহি দেখে কূল ।।
সাধুর দুর্গতি দেখি জগাতী কমলা।
রামকলা কাটিয়া চাঁদেরে দিল ভেলা।।
ভেলায় চাপিয়া সাধু পাইল গিয়া তড়।
শিব শিব বলি সাতবার করে গড় ।।
লজ্জা ভয়-পাকে রয় জলেতে বসিয়া।
নেত সে ধোপানী তবে বলিল হাসিয়া।।
নেত বলে চাঁদবেনে তোমা নাহি জানে।
এবার সঙ্কটে ওরে রাখো গো মা প্রাণে ।।
বস্ত্র বিবর্জিত সাধু কাতর হৃদয়।
মনসার পাদপদ্মে কেতকাতে গায় ।।

গদ্যান্তরঃ
হনুমান তো লম্ফ দিয়ে চাপল নৌকায়। আর সাধুর নৌকাও তার সঙ্গে কাঁপতে কাঁপতে খেতে লাগল চরকিপাক। আর তাই না দেখে নৌকার বাঙাল মাল্লারা তো ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। বলতে লাগল, “সব কিছুই তো জলে ভেসে গেল, আমরা যে কাঙাল হলাম। পোস্তের মালসাগুলো ছাকনির কাপড়ের মতো জলের তোড়ে কোথায় চলে গেল! টুকরো টুকরো হয়ে গেল পরনের কাপড়। ওই চাঁদবেনের পাকে পড়ে আমরাও প্রাণ হারালাম। এতো চুরি-ডাকাতি নয়, যে প্রতিকার চাওয়া যাবে কারোর থেকে।” এই বলে তারা সব এদিক ওদিক ভেসে যেতে লাগল।
এদিকা মনসার কূটচালে হাবুডুবু খেতে লাগলেন চাঁদ। জল খেয়ে খেয়ে তাঁর চোখ লাল হয়ে গেল। তবু বলতে লাগলেন, “দুঃখ দিলি চেঙমুড়ি কানি।” রথে বসে সে কথা শুনে হেসে ফেললেন বিষহরী মনসা। চাঁদের বসার জন্য তিনি পদ্ম ফুটিয়ে দিলেন একখানা। অকূল সমুদ্রে কূলহারা চাঁদ সম্মুখে হঠাৎ দেখতে পেলেন সেই পদ্ম। কিন্তু তা তিনি স্পর্শও করলেন না। বললেন, “ওই পদ্ম মনসায় জন্ম নিয়েছে। ও-পদ্ম ছুঁলে আমার অধর্ম।” তখন জগদ্ধাত্রী কমলার মনে দয়া হল। তিনি কলাগাছ কেটে ভেলা বানিয়ে দিলেন চাঁদকে। সেই ভেলায় চড়ে তটে ফিরলেন চাঁদ। ফিরেই ‘শিব শিব’ বলে সাতবার প্রণাম ঠুকলেন তাঁর ইষ্টদেবতা মহাদেবকে।
কিন্তু লজ্জা আর ভয়ে অভিভূত উলঙ্গ চাঁদ সদাগর বসে রইলেন জলেই। আর তাই দেখে নেতা ধোপানি মনসাকে বললেন, “মাগো, চাঁদ জানে না তুমি কে। এবার তার প্রাণ তুমি রক্ষা করো।”

সূত্রঃ
১. উইকিপিডিয়া
২. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা দর্পন।

2 comments on “মনসামঙ্গল কাব্য

  1. রাহাত-ই-আফজা
    ডিসেম্বর 11, 2010

    আমিনুল খুব ভাল লাগলো আপনার এই পোষ্টটা। অনেক গুছিয়ে লিখেছেন। অসাধারন লাগলো।🙂

    Like

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on জানুয়ারি 26, 2010 by in সাহিত্য and tagged .

নেভিগেশন

%d bloggers like this: