আম আঁটির ভেঁপু

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো…

ভারতে ব্রিটিশ শাসন (প্রথম পর্ব)

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬১২ সালে ভারতে প্রথম তাদের বানিজ্য কুঠি স্থাপন করে।এর পর দেড়শ বছর ধরে মুঘল সম্রাটের অনুমতিক্রমে ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাদের ব্যবসা বানিজ্যের বিস্তার ঘটান। এই সময় মূলত তাদের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দী ছিল ইউরোপ থেকে আসা অন্যান্য কোম্পানি। ১৭০৭ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষমতাহ্রাস ও ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয়, কোম্পানিকে ক্রমশ সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী করে তোলে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিনত হয়। ফলশ্রুতিতে এর সমস্ত সম্পত্তিকে ব্রিটিশ রাজের সম্পত্তি হিসেবে অধিভুক্ত করা হয়।

ফোর্ট উইলিয়াম , কোলকাতা ১৮০৭

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের অবসান হলে “ভারত সরকার আইন ১৮৫৮” (Government of India Act 1858) পাশের মাধ্যমে কোম্পানি শাসনের অবসান হয়। এর পর থেকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরাসরি ব্রিটিশ রাজের অধীনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি হিসেবে শাসিত হয়। ১৮৭৬ সাল থেকে একে সরকারিভাবে ভারত সাম্রাজ্য (Empire of India) হিসেবে ঘোষনা করা হয়।

লন্ডনের লীডেনহল স্ট্রীটে ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস (১৮১৭) ( এটি ১৯২৯ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়)

মূলত ভারতবর্ষ তিন ধাপে ব্রিটিশ শাসকদের মাধ্যমে শাসিত হয়।

১. কোম্পানি ও দেশিয় নবাবের দ্বৈত শাসন (১৭৫৭-১৭৭০)

২. কোম্পানি শাসন (১৭৭০-১৮৫৮)

৩. ব্রিটিশ রাজের শাসন (১৮৫৮-১৯৪৭)

কোম্পানি ও দেশিয় নবাবের দ্বৈত শাসন (১৭৫৭-১৭৭০)

রবার্ট ক্লাইভ

রবার্ট ক্লাইভ (Robert Clive) (১৭৫৭-৬০) (১৭৬৫-৬৭)

রবার্ট ক্লাইভ ২৯ সেপ্টেম্বর ১৭২৫ সালে বৃটেনে জন্ম গ্রহন করেন এবং মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর সামান্য কেরানী হিসেবে মাদ্রাজ আসেন। ১৭৫১ সালে তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। কর্নাটের যুদ্ধে ক্লাইভ ফরাসীদের পরাজিত করে খ্যাতি অর্জন করেন।

ফ্রান্সিস হাইমানের (Francis Hayman) আঁকা  পলাশী যুদ্ধ ক্ষেত্রে মীরজাফরের সাথে ক্লাইভের সাক্ষাত

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে জয়লাভ করে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কারস্বরূপ মীরজাফরকে সিংহাসনে বসান। এই যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা স্বাধীনতা হারায়, ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের সুত্রপাত। মীর জাফর নামমাত্র নবাব থাকেন, পশ্চাতে ক্লাইভ প্রচ্ছনভাবে ক্ষমতা হস্তগত করেন।তিনি ১৭৫৭-৬০ সাল পর্যন্ত ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন।১৭৫৯ সালে বিদরের যুদ্ধে ক্লাইভ ওলন্দাজদের পরাজিত করেন। ১৭৬০ সালে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। এ সময় ফোর্ট উইলিয়ামের অন্তর্বর্তীকালীন গভর্নর ছিলেন ভান্সিটার্ট।

হেনরি ভান্সিটার্ট (Henry Vansittart) (১৭৫৯-৬৪)

১৭৬৪ সালে নবাব মীর কাশিমের বিরুদ্ধে বক্সারের যুদ্ধে ভান্সিটার্টের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনীর জয়লাভের ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ ক্লাইভকে আবার দ্বিতীয় মেয়েদে ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর করে পাঠায়। বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের ভিত্তি মজবুত করে। ক্লাইভ ১৭৬৫ সালের মে মাসে দ্বিতীয় মেয়াদে আবার ভারতবর্ষে আসেন।

বক্সারের যুদ্ধের পরে ক্লাইভের মধ্যস্ততায় এলাহাবাদে কোম্পানি, সম্রাট ও নবাবের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ানী ক্ষমতা লাভ করেন। বিনিময়ে কোম্পানি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব আদায়সহ রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ব্যয় নির্বাহের জন্য বাংলার নবাবকে বার্ষিক ৫৩ লাখ টাকা ও দিল্লীর সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লাখ টাকা প্রদান করবে।

রবার্ট ক্লাইভ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে (১২ আগস্ট, ১৭৬৫) যে ফরমান লাভ করে তাতে কোম্পানি শুধু দিউয়ানী ক্ষমতার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারীর মর্যাদা লাভ করেন। রাজস্ব কেন্দ্রীয়ভাবে কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করলেও রাজস্ব আদায় করবে নবাবের কর্মচারীরা এবং যাবতীয় শাসনকার্য পরিচালনা করবে নবাব। কিন্তু অর্থ বিভাগ কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করায় নবাব ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ব্যবস্থায় নবাবের ছিল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব, আর কোম্পানি লাভ করল দায়িত্বহীন ক্ষমতা।ইতিহাসে এটি দ্বৈত শাসন নামে পরিচিত।

দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় ব্যপক কুফল দেখা যায়। জমির ফসল ঠিক মত না হলেও কারো রাজস্ব মাফ করা হত না। কোম্পানি রাজস্বের পরমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির কর্মচারীদের ওপর চাপ দিতে থাকে। ক্লাইভ দেশে প্রত্যাবর্তন করলে এই দ্বৈত শাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ১৭৬৮-৬৯ সালে অনাবৃষ্টির কারনে জমিতে ফসল না হওয়ায় ১৭৭০ সালে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এ সময় বাংলার গভর্নর ছিলেন ভেরেলস্ট (১৭৬৭-৬৯) এবং কার্টিয়ার (১৭৬৯-৭০)। ১৭৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬) দুর্ভিক্ষে প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোকের প্রাণহানি ঘটে। যারা বেঁচে ছিল তারা অনেকেই মৃত মানুষের মাংস খেয়ে থাকত। এ দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষও এ দুর্ভিক্ষের জন্য দ্বৈত শাসনকে দায়ী করেছিল। ১৭৭২ সালে কোম্পানির বোর্ড অফ ডিরেক্টরস দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে দেশের প্রশাসনের দায়িত্ব সরাসরি কোম্পানির হাতে নেওয়ার জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসকে বাংলার গভর্নর করে পাঠান।

ইংল্যান্ডের শ্রিউসবুরিতে (Shrewsbury) ক্লাইভের ভাস্কর্য

জশুয়া রেনলডস (Joshua Reynolds) এর আঁকা ছবিতে ক্লাইভ ও তাঁর পরিবার এবং ভারতীয় গৃহকর্মী

ক্লাইভ ১৭৬৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে আসেন।ভারতবর্ষে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ইংল্যান্ডের রাজনীতি দুষিত করার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।অভিযোগে বলা হয়, তিনি বাংলার গভর্নর থাকাকালীন ক্ষমতার অপ-ব্যবহার ও ঘুষের মাধ্যেমে এই পাহাড়সম অর্থ-বিত্ত গড়েছেন। অভিযোগ প্রমানিত হয় নি, তা সত্তেও তিনি ২২ নভেম্বর ১৭৭৪ সালে আত্ন-হত্যা করেন।ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় ক্লাইভের অবদান অনস্বীকার্য।

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

4 comments on “ভারতে ব্রিটিশ শাসন (প্রথম পর্ব)

  1. নিবিড়
    জুন 13, 2010

    ভাল লাগল ছবির কালেকশনটা

    Liked by 1 person

    • অনেক কৃতজ্ঞতা ভাই।
      আসলে এটা নিয়ে একটা ফিচার লেখার ইচ্ছা আছে। আজ শুধু ছবিগুলো যোগ করেছি। পর্যায়ক্রমে লেখাগুলো যোগ করব।
      শুভেচ্ছা।

      Like

  2. মাহফুজুল ইসলাম
    অগাষ্ট 19, 2010

    আমিনুল ভাই,লেখাটা পরলাম।ভাল লাগল।carry on man…

    Like

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on জুন 12, 2010 by in ইতিহাস and tagged .

নেভিগেশন

%d bloggers like this: