আম আঁটির ভেঁপু

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো…

ভারতে ব্রিটিশ শাসন (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রথম পর্ব
কোম্পানি শাসন (১৭৭০-১৮৫৮)
ওয়ারেন হেস্টিংস


ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings) (১৭৭২-৮৫)

ওয়ারেন হেস্টিংস ছিলেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রথম উদ্যোক্তা। রাইটার বা কেরানি পদে কোম্পানিতে চাকরি শুরু করে পরবর্তীতে তিনি ভারতে কোম্পানির সর্বোচ্চ পদের অধিকারী হন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ফলে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের নিদারুণ বিপর্যয়ের যুগে তিনি ১৭৭২ সালে গভর্নর হিসেবে ফোর্ট উইলিয়ামের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালের এপ্রিল থেকে ১৭৭৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলার গভর্নর (কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর) ছিলেন। ভারতবর্ষে কোম্পানি শাসিত এলাকায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর উদ্দ্যশে ১৭৭৩ সালে নিয়ামক বিধি ১৭৭৩(Regulating Act 1773) পাশ হয়। নিয়ামক বিধি অনুযায়ী হেস্টিংস ১৭৭৪-৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলার গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৭৭২ সালে রাজস্ব আদায়ের পূর্ববর্তী ব্যবস্থা বাতিল করে পঞ্চসনা বন্দোবস্ত চালু করেন। এ ব্যবস্থায় যে ব্যক্তি সর্বোচ্চ নিলাম ডাকবে, সে পাঁচ বছরের জন্য জমির ইজারা পাবে।১৭৭৩-৭৪ সাল পর্যন্ত তার নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী রোহিলা যুদ্ধে অংশ নেয়। হেস্টিংস দীর্ঘ দিন মহীশূরের শাসনকর্তা হায়দার আলী (দ্বিতীয় ইঙ্গো-মহীশূর যুদ্ধ ১৭৮০-৮৪) ও মারাঠাদের (প্রথম ইঙ্গো-মারাঠা যুদ্ধ ১৭৭৬-৮২) সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৭৮৪ সালে হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতান ও ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে ম্যাঙ্গালোরের চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আপাতত এই দ্বন্দের অবসান ঘটে। ১৭৭৪ সালে মহারাজা নন্দ কুমারের বিচারে ফাঁসি কার্যকর হয়। ১৭৭৮ সালে রাজস্বের পর্যাপ্তে চাহিদা মেটাতে না পারার কারনে হেস্টিংস চৈত সিংকে (বেনারস রাজ্য) সিংহাসন চ্যূত করে বন্দী করেন এবং মহীপ নারায়নকে বেনারসের সিংহাসনে বসান।

হেস্টিংস ১৭৭২ সালে দিউয়ানী ও ফৌজদারী আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৮০ সালে জেমস অগাস্ট হিকি (James August Hickey) বেঙ্গল গেজেট(Bengal Gazette or Calcutta General Advertiser) নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর সহায়তা নিয়ে ১৭৮৪ সালে উইলিয়াম জোন্স(William Jones) এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic society of Bengal) প্রতিষ্ঠা করেন।১৭৮১ সালে হেস্টিংস কোলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সময়ে উইলিকনস(Wilkins) গীতা ও হিতপদেশ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।

কোম্পানি শাসিত ভারতবর্ষের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্দ্যশে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৭৮৪ সালে পিট’স ইন্ডিয়া এ্যাক্ট (Pitt’s India Act 1984) পাশ করে। এই আইন অবশ্য গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিটের (William Pitt) সাথে মতদ্বৈততা দেখা দেওয়ায় হেস্টিংস ১৭৮৫ সালে পদত্যাগ করে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন।

১৭৮৫ সালে ব্রিটিশ হাউস অফ লর্ডসে (House of Lords) তার বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্ট প্রকৃয়া শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল
ক) চৈত সিংহ ঘটনাবলী (The affairs of Chait Singh)
খ) রোহিলা যুদ্ধ (The Rohilla War)
গ) অযোধ্যার বেগমের সাথে রূঢ় আচরন (The ill-treatment of the Begums of Oudh) এবং
ঘ) নন্দ কুমার ঘটনাবলী (The Nand Kumar affairs)।
১৭৮৮-৯৫ পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর এই বিচার চলার পর লর্ডসভা তাঁকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেন।

লর্ড কর্নওয়ালিস


লর্ড কর্নওয়ালিস( Lord Cornwalis) (১৭৮৬-৯৩)

১৭৮৫ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস পদত্যাগ করলে লর্ড জন ম্যাকফারসন (Lord John McPherson) অস্থায়ী গভর্নর জেনারেল হিসেবে এক বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস একইসাথে গভর্নর জেনারেল ও ব্রিটিশ সেনাপতি হিসেবে ভারতবর্ষে আসেন।ওয়ারন হেস্টিংস ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূল স্থাপন করেছিলেন এবং সে ভিত্তির ওপর কাঠামো নির্মান করেছিলেন কর্নওয়ালিস। তিনি প্রশাসনিক ও আইনগত সংস্কার দ্বারা নামমাত্র নবাবি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনকে একটি সুশৃঙ্খল ও প্রথাবদ্ধ রূপ দান করেন।

কর্নওয়ালিস বাণিজ্য সংক্রান্ত, বিচার-ব্যবস্থা, পুলিশ-ব্যবস্থা (১৭৯১), ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা (১৭৯৩), কর্মচারী বিধি-বিধান প্রভৃতিক্ষেত্রে আমূল সংস্কার করেন।১৭৯৩ সালের মে মাসে ৪৮টি রেগুলেশন বা আইন নিয়ে ঐতিহাসিক শাসনতন্ত্র ঘোষনা করেন যা ‘কর্নওয়ালিস কোড’ নামে পরচিত। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু ও সূর্যাস্ত আইন প্রনয়ন করেন। ১৭৯১ সালে তাঁর সহায়তায় জ়নাথন ডানকান (Jonathan Duncan) বেনারসে সংস্কৃত কলেজ (Sanskrit College) প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৭৯২ সালে কর্নওয়ালিস তৃতীয় ইঙ্গো মহীশূর যুদ্ধে টিপু সুলতানকে পরাজীত করেন।

১৭৯৩ সালের শেষভাগে তিনি গভর্নর জেনারেলের পদ থেকে অবসর গ্রহন করেন। ১৮০৫ সালে পুনরায় তাঁকে ভারতের গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহনের তিন মাসের মধ্যে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

স্যার জন শোর

স্যার জন শোর ( Sir John Shore) (১৭৯৩-৯৮)

কর্নওয়ালিস গভর্নর জেনারেলের পদ থেকে অবসর গ্রহনের পর তাঁর রাজস্ব উপদেষ্টা স্যার জন শোর গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত হন। মূলত তিনিই ছিলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার প্রবর্তক। ১৭৯৫ সালে তিনি খারদা যুদ্ধে (Battle of Kharda) নিজাম ও মারাঠাদের বিরূদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে নিজাম পরাজিত হন। তাঁর শাসন আমলে প্রথম চার্টার অ্যাক্ট ১৭৯৩ (The 1st Charter Act of 1793) প্রণিত হয়।

লর্ড ওয়েলেসলি

লর্ড ওয়েলেসলি (Lord Wellesley) (১৭৯৮-১৮০৫)

১৭৯৮ সালের এপ্রিল মাসে লর্ড অয়েলেসলি গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্ত হয়ে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি ছিলেন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী। ১৭৯৮ সালে তিনি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (the system of Subsidiary Alliance) ব্যবস্থা প্রচলন করে অনেক ভারতীয় রাজ্যকে ব্রিটিশ সামরিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলেন।১৭৯৮ সালে হাইদ্রাবাদ প্রথম অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর পরে একে একে মহীশূর, তাঞ্জোর, যোধপুর, জয়পুর, আভাদ, মেছেরি, বুন্দি, ভারতপুর, বেরার প্রভৃতি রাজ্য যোগ দেয়। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গো মহীশূর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে টিপু সুলতান পরাজীত ও নিহত হন।

নবাগত ইংরেজ কর্মচারীদের ভারতীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ সালে কোলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

জর্জ বার্লো

জর্জ বার্লো (George Barlow) (১৮০৫-০৭)

কর্নওয়ালিসের আকস্মিক মৃত্যুর পর স্যার রাজা বার্লো ১৮০৫ সালে অস্থায়ী গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। বার্লোর শাসনকালে ১৮০৬ সালে দক্ষিণ ভারতের ভেলোর নামক স্থানে সিপাহী বিদ্রোহ দেখা দিলে অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল।

লর্ড মিন্টো-১

লর্ড মিন্টো-১ (Lord Minto – I) (১৮০৭-১৩)

১৮০৭ সালে লর্ড মিন্টো গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৮০৯ সালে তিনি চার্লস মেটকাফকে শিখবীর রঞ্জিত সিংহের রাজসভায় প্রেরণ করে তাঁর সাথে ইংরেজদের অমৃতসর চুক্তি (Treaty of Amritsar) স্বাক্ষর করাতে সক্ষম হন। তাঁর শাসন আমলে চার্টার অ্যাক্ট ১৮১৩ (Charter Act of 1813) প্রণিত হয়।

লর্ড হেস্টিংস

লর্ড হেস্টিংস (Lord Hastings) (১৮১৩-২৩)

লর্ড হেস্টিংসের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী গোর্খা যুদ্ধ বা ইঙ্গ-নেপালী যুদ্ধে (the Gorkha war or the Anglo Nepalese war) (১৮১৩-২৩)বিজয় অর্জন করে এবং তিনি কৃতিত্ত্ব স্বরূপ Marquess of Hastings খেতাব লাভ করেন। তিনি ১৮২০ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীতে রায়ত প্রথা (Ryotwari settlement) চালু করেন এবং থমাস মুনরোকে (Thomas Munro) গভর্নর করে পাঠান। তিনি রাজপুতদেরকে ব্রিটিশদের স্বভাবজাত শত্রু বিবেচনা করতেন। তাঁর শাসন আমলে স্যার থমাস হেসলপ (Sir Thomas Hislop) পিন্ডারি যুদ্ধে (Pindari War) (১৮১৭-১৮)পিন্ডারি উপজাতিদের পরাজিত করে ব্রিটিশ শাসনভুক্ত করেন।।

হেস্টিংস পাঠানদের পরাজীত করেন এবং নবাব আমির খানকে পাঠানদের নেতা মনোনয়ন দেন। তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে (Third Anglo-Maratha war) (১৮১৭-১৮) মারাঠাদের পরাজীত করে বোম্বে প্রেসিডেন্সীকে ব্রিটিশ শাসনভুক্ত করেন।

লর্ড আমহার্স্ট

লর্ড আমহার্স্ট (Lord Amherst) (১৮২৩-২৮)

১৮২৩ সালে আমহার্স্ট গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্ত হন। তিনি মালয় পেনিনসুলা (Malay Peninsula) জয় করেন এবং সেখানে সিয়ামদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাঁর শাসন আমলে ইংরেজ বাহিনী প্রথম ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধে (First Burmese War) (১৮২৪-২৬০ জয় লাভ করে এবং ১৮২৬ সালে ইয়ান্দাবু চুক্তি (reaty of Yandaboo) স্বাক্ষরিত হয়, এর ফলে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বার্মার দক্ষিণ উপকূল ও রেঙ্গুনে কুঠি স্থাপন ও ব্যবসা করার অধিকার পায়। বার্মায় যুদ্ধ ও বেতন স্বল্পতা প্রভৃতি কারনে বাংলার বারাকপুর ছাউনিতে সিপাহীরা ১৮২৪ সালে বিদ্রোহ করে। নির্দয়ভাবে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়।

লর্ড আমহার্স্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে ১৮২৮ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক (Lord William Bentick) (১৮২৮-৩৫)

লর্ড আমহার্স্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে ১৮২৮ সালের জুলাই মাসে উইলিয়াম বেন্টিক গভর্নর জেনারেল হিসেবে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি ছিলেন বৃটেনের হুইগ বা উদারতন্ত্রী দলের সমর্থক। গভর্নর জেনারেল হিসেবে লর্ড উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিস বেন্টিকের শাসনকাল (১৮২৮-৩৫) ছিল শান্তি ও সংস্কারের যুগ।

ফোর্ট উইলিয়াম , কোলকাতা ১৮২৭

১৮৩৩ সালের চার্টার এ্যাক্টের (The Charter Act 1833) মাধ্যমে গভর্নর জেনারেল পদবী বদলে গভর্নর জেনারেল অব ইন্ডিয়া (Governor General of India) হয়। সেই হিসেবে লর্ড বেন্টিক বৃটিশ ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল। এর আগে যে সব গভর্নর জেনারেল ছিলেন, তাঁরা কোলকাতা কেন্দ্রিক ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর জেনারেল হয়ে সমস্ত ব্রিটিশ ভারতবর্ষ শাসন করতেন।

বেন্টিক ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেলদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদার ও উচু মনের ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ হয়েও ভারতবাসীর সার্বিক কল্যানে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। অর্থনীতি, শাসন সংক্রান্ত ও সামাজিক ক্ষেত্রে তিনি ব্যপক ভিত্তিক কল্যানকর সংস্কার সাধন করেছিলেন।

বেন্টিক বিচার বিভাগের উন্নতি সাধন করেন। তিনি সরকারী পদে ভারতীয়দের নিয়োগের নীতি চালু করেন। বিচার বিভাগের উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগ এবং তাঁদের বিচার ক্ষমতা, পদ-মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি করেন। তিনি ১৮২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৭ নম্বর রেগুলেশন দ্বারা ‘সতিদাহ প্রথা’ নিষিদ্ধ করেন। এই আইন ১৮২৯ সালে শুধুমাত্র বাংলা প্রদেশে চালু হয় এবং ১৮৩০ সালে মাদ্রাজ ও বোম্বেতে প্রবর্তিত হয়। তিনি সেই সময়ে প্রচলিত শিশু-হত্যা প্রথা ও গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন দন্ডনীয় অব্রাধ বলে ঘোষণা করেন।

১৮৩০ সালে বেন্টিকের নির্দেশে ইন্ডিয়ার ফ্যান্টম খ্যাত কর্নেল উইলিয়াম স্লীম্যান (William Sleeman) ঠগীদস্যুদের দমন করেন।১৮৩৪ সালে আগ্রা প্রদেশ সৃষ্টি করেন। ১৮৩৫ সালে ইংরেজীকে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করেন এবং উচ্চ আদলতে কার্যাবলী ফারসীর পরিবর্তে ইংরেজীতে চালু করেন ও সরকারী অর্থে ইংরেজী ও বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তাঁর শাসন আমলে ১৮৩১ সালে তিতুমীর নারকেলবাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা বানিয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ডাক দেন এবং যুদ্ধে তিতুমীর শহীদ হন। ১৮৩১ সালে মহীশূর ব্রিটিশ রাজের অন্তর্ভুক্ত হয়।

বেন্টিক নদী ও সমুদ্র পথে বাষ্পীয় পোত (Steamer) চলাচলে উৎসাহ দেন। তিনি চা-বাগান স্থাপন ও জল-সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন।

স্যার চার্লস মেটকাফে

স্যার চার্লস মেটকাফে (Sir Charles Metcalfe) (১৮৩৫-৩৬)

উইলিয়াম বেন্টিক ১৮৩৫ সালে দেশে ফিরে আসেন। এর পরে স্যার চার্লস মেটকাফ অস্থায়ীভাবে গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্ত হন। “Press Law” ঘোষণা করে তিনি সংবাদপত্রের উপরে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দান করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের তীব্র বিরোধিতা ও সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এই উদারচেতা গভর্নর জেনারেল পদত্যাগ করে ১৮৩৬ সালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

লর্ড অকল্যান্ড

লর্ড অকল্যান্ড (Lord AuckLand) (১৮৩৬-৪২)

লর্ড অকল্যান্ড ১৮৩৬ সালে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। শাসনভার গ্রহন করেই তিনি জনকল্যাণমূলক সংস্কার কার্যাবলীতে মনোনিবেশ করেন। কৃষিকার্যের সুবিধার জন্য তিনি সেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলেন। তাঁর সময়ে (১৮৩৭-৩৮) উত্তর ভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় ৮ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়। প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ (১৮৩৬-৪২) তাঁর শাসনামলে সংগঠিত হয়। এ যুদ্ধে ব্রিটিশদের বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটে। আফগান যুদ্ধে চরম বিফলতায় হতমর্যাদা ও অপদস্ত হয়ে অকল্যান্ড পদত্যাগ করে ইংল্যান্ডে ফিরে যান।

লর্ড এলেনবরা

লর্ড এলেনবরা (Lord Ellenborough) (১৮৪২-৪৪)

লর্ড অকল্যান্ডের পদত্যাগের পর লর্ড এলেনবরা ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। তাঁর সময়ে ১৮৪৩ সালে প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ শেষ হয়। ১৮৪৩ সালে তিনি সিন্ধু বিজয় করেন। চার্লস নেপিয়ার চার বছর সিন্ধুর শাসক হিসেবে চরম ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছেলন। তিনি চার্লস নেপিয়ারের স্থলে মেজর আউটরামকে সিন্ধুর শাসক নিযুক্ত করেন। লর্ড এলেনবরা ১৮৪৩ সালে ভারতবর্ষে দাস প্রথা বিলুপ্ত করেন। তাঁর আমলেই সর্বপ্রথম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বেতন ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করে তিনি পুলিশ ব্যপক উন্নতি সাধন করেছিলেন।

লর্ড হার্ডিঞ্জ

লর্ড হার্ডিঞ্জ (Lord Hardinge) (১৮৪৪-৪৮)

লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ সালে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। তিনি প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে (১৮৪৫-৪৬) শিখ বাহিনীকে পরাজিত করে যুদ্ধের ক্ষতিপূরন বাবদ দেড় কোটি টাকা দাবি করেন। শিখ রাজ্যের পক্ষে তা দেওয়া অসম্ভব হওয়ায় জম্মুর শাসক গুলার সিংহের কাছে ৭৫ লক্ষ টাকা্র বিনিময়ে কাশ্মীর রাজ্য বিক্রয় করা হয়। সেই থেকে ভারত বিভক্ত হওয়া পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর ব্রিটিশ শাসনাধীন বিশেষ শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা ভোগ করেছিল। গুলার সিং মাসিক তিন টাকা বেতনে সিপাহী পদে নিযুক্ত হয়ে কালক্রমে রনজিৎ সিংহের (১৭৮০-১৮৩৯) অধীনে জম্মুর শাসক হয়েছিলেন। লর্ড হার্ডিঞ্জের অনুগ্রহে তিনি জম্মু ও কাশ্মীর মহারাজা হন।

লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রজাহিতৈষি শাসক ছিলেন। ভারতবর্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ভারতীয় রেলপথ নির্মাণ পরিকল্পনার প্রাথমিক কার্যাদি তিনি শুরু করেছিলেন। তিনি উড়িষ্যার পার্বত্যাঞ্চলে খোন্দ জাতির মধ্যে প্রচলিত বর্বরোচিত নরবলি প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

লর্ড ডালহৌসি

লর্ড ডালহৌসি (Lord Dalhousie) (১৮৪৮-৫৬)

লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ সালে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। গভর্নর জেনারেল হয়ে ভারতবর্ষে আসার পূর্বে তিনি ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ছিলেন। তিনি একাধারে ভারতের গভর্নর জেনারেল ও বাংলার গভর্নর, উভয় দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। সকাল ৮.৩০ থেকে বিকাল ৫.৩০ পর্যন্ত নিয়মিত অফিস করতেন। মাত্র ২৫ বছরে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অগ্রনায়কদের মধ্যে তাঁর অবস্থান একেবারেই প্রথম সারিতে।

ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদ নীতির তিনটি পন্থা ছিল,

ক) যুদ্ধের দ্বারা রাজ্য বিস্তার,

খ)স্বত্ব বিলোপ নীতির (Doctrine of Lapse)  প্রয়োগ দ্বারা রাজ্য দখল এবং

গ) অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে দেশীয় রাজ্য অধিকার।

স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রয়োগ দ্বারা তিনি সাতারা (১৮৪৮), যৌতপুর এবং সম্বলপুর (১৮৪৯), ভগত (১৮৫০), উদয়পুর (১৮৫২), ঝাঁসি (১৮৫৩) এবং নাগপুর (১৮৫৪) প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের অধীন আনেন।

ডালহৌসি ১৮৪৯ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ (১৮৪৮-৪৯) যুদ্ধে জয় লাভ করেন, নিখিল পাঞ্জাবকে ব্রিটশ সাম্রাজ্যধীন করেন। তিনি ১৮৫৩ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-বার্মিজ যুদ্ধে জয় করে বার্মার নিম্নাংশ (পেগু) ব্রিটশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। তাঁর শাসনামলে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ দেখা দেয়।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ স্বার্থকে সমুন্নত রাখার জন্য লর্ড ডালহৌসি বহু জন-হিতকর কাজ করেছিলেন।কারা ব্যবস্থার উন্নতি, সস্তায় ডাকে চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ লাইন (৪০০০) স্থাপন, খাল খনন, বনজ সম্পদ রক্ষা ও বৃদ্ধি, নৌ-পথে যাতায়াত উন্নতকরণ, রাস্তা-পুল নির্মাণ প্রভৃতি তাঁর উল্ল্যেখযোগ্য কীর্তি।ডাক, তার ও রেল ব্যবস্থার প্রথিষ্ঠাতা হিসেবে ডালহৌসির খ্যাতি অবিস্মরণীয়। ১৮৫৩ সালে তাঁর শাসনামলে প্রথমে বোম্বে থেকে থানে, পরে কোলাকাতা থেকে রানীগঞ্জে রেল লাইন স্থাপন করা হয়। ১৮৫৩ সালে কোলকাতা থেকে আগ্রা পর্যন্ত টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করা হয়।

তিনি ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে প্রভূত উদ্যোগ নেন। তাঁর শাসনামলে চার্লস উডের নেতৃত্বে Wood’s dispatch প্রণিত হয়, যা ভারতে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে ম্যাগনাকার্টা (Magna Carta of English education) নামে পরিচিত। এর অধীনেই পরবর্তিতে ১৮৫৭ সালে কোলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া, তিনি জেলা শহরে স্কুল, গুরুত্বপূর্ণ শহরে সরকারি কলেজ স্থাপন করেন। ভারতের উত্তরখন্ডের রূক্রীতে তিনি একটি প্রকৌশ কলেজ স্তাহপন করেন। ষোড়শ শতকে সম্রাট শের খানের তৈরী প্রাচীন গ্রান্ড ট্রাংক রোডটি তিনি পূনরায় স্থাপন করেন। তিনি ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাশ করেন। ১৮৫৩ সালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে কর্মকর্তা নিয়োগ শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে পোস্ট অফিস অ্যাক্ট (Post Office Act) পাশ করেন এবং ১৮৫৩ সালে ভারতে প্রথম বারের মত ডাকটিকিটের প্রচলন করেন।

ভারতে আট বছরের শাসনকালের পরিশ্রমে ডালহৌসি ভগ্নস্বাস্থ্য অবস্থায় ১৮৫৬ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যান এবং ১৮৬০ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অনেক সমালোচক মনে করেন, ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারনীতি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের ভিত্তি তৈরী করেছিল।

তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on জুন 14, 2010 by in ইতিহাস and tagged .

নেভিগেশন

%d bloggers like this: